ডক্টরস কলাম

এভাবে ডাক্তাররা আর কতকাল মার খাবে?

১৯৯৬ সালে পঞ্চগড়ে জাতীয় সংসদের নির্বাচনে কাজ করতে গিয়েছিলাম। নতুন এলাকা, প্রায় কিছুই চিনি না। আমার চলাফেরার জন্য একটা লাল রংয়ের ১০০ সিসির হোন্ডা মোটর সাইকেল দেওয়া হল, সাথে চালানোর জন্য খায়রুল ভাই। ছোটখাটো গড়নের পাতলা শরীর, কিন্তু চোখ দুটো যেন জ্বলজ্বল করে। সাত বছর জেল খেটে সদ্য বেরিয়েছে, জাসদ ছাত্রলীগ করতেন। শহরে একবার একটা গণ্ডগোলে কর্তব্যরত ম্যাজিস্ট্রেটের উপর হামলা করার অপরাধে সাত বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেছিলেন খায়রুল ভাই। কর্তব্যরত অবস্থায় কোন ডিসি, ম্যাজিস্ট্রেট বা পুলিশ কর্মকর্তার উপর আক্রমণের তেমন কোন খবর সচরাচর আমাদের চোখে পড়ে না। আর যদি এরকম কোন আক্রমণের ঘটনা ঘটেও, আক্রমণকারীদের অবিলম্বে আইনের আওতায় সাজা প্রদান করা হয়।

অথচ কর্মক্ষেত্রে প্রায়ই সরকারী চিকিৎসকরা রোগীর আত্মীয়স্বজন এবং স্থানীয় সন্ত্রাসীদের হাতে শারীরিরভাবে নিগৃহীত-প্রহৃত হোন। অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায়, স্থানীয় পুলিশও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা প্রদানের পরিবর্তে সন্ত্রাসীদের পক্ষাবলম্বন করছে। ঝামেলা এড়ানোর জন্য ডাক্তাররাও মামলার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী হয় না। আবার আগ্রহী হলেও দেখা যায়, মামলা নেবার ব্যাপারে অনেক সময়ই স্থানীয় থানার পুলিশ নানান রকমের টালবাহানা করছে। চিকিৎসক নিগ্রহের একটা ঘটনা ঘটার পর আমরা চিকিৎসকরা এনিয়ে কিছুদিন হৈ চৈ করি, তারপর ঝিমিয়ে গিয়ে পরের সন্ত্রাসী ঘটনায় আবার জেগে উঠি। এভাবেই একের পর এক দেশব্যাপী চিকিৎসকদের উপর সন্ত্রাসী হামলা চলতেই থাকে। এই হামলা রোধে নীতিনির্ধারকদেরও তেমন কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। নতুবা আজ অব্দি চিকিৎসক সুরক্ষা আইন কিংবা ২০১৪ সালের স্বাস্থ্য সেবা আইনের খসড়া কেন চুড়ান্ত করা হচ্ছে না?

সুনির্দিষ্ট আইনের অনুপস্থিতিতে আমাদের বসে থাকলে চলবে না। বরং প্রচলিত আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহের প্রয়োগ করেই প্রতিবাদ করতে হবে। আসুন আমরা আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাসমূহ একটু জেনে নেই। সরকারি কর্মচারীকে তার কাজ সম্পাদনে বাধা দান কিংবা সরকারি কর্মচারীকে কর্তব্য সম্পাদনে বাধা দানের উদ্দেশ্যে আক্রমণের বিষয় বর্ণিত রয়েছে দণ্ডবিধির ১৮৬ ও ৩৫৩ ধারায়। সরকারি কর্মচারীকে কাজ সম্পাদনে বাধাদানের বিষয়ে দণ্ডবিধির ১৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি কোনো সরকারি কর্মচারীদের সরকারি কার্যাবলী সম্পাদনে ইচ্ছাপূর্বক বাধা দান করে, তবে সেই ব্যক্তি তিন মাস পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে অথবা পাঁচশত টাকা পর্যন্ত যেকোনো পরিমাণ অর্থদণ্ডে অথবা উভয়বিধ দণ্ডে দণ্ডিত হবে।’

সরকারি কর্মচারীকে তার কর্তব্য সম্পাদনে বাধা দানের উদ্দেশ্যে আক্রমণ অথবা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করার বিষয়ে দণ্ডবিধির ৩৫৩ ধারায় বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি যদি এমন অন্য কোনো ব্যক্তিতে আক্রমণ করে বা তার ওপর বলপ্রয়োগ করে, যে অন্য ব্যক্তি সরকারি কর্মচারী হিসেবে কর্তব্য সম্পাদনরত একজন সরকারি কর্মচারী অথবা অনুরূপ কর্মচারীকে তার সরকারি কর্মচারী হিসেবে করণীয় কর্তব্য সম্পাদনে বাধা দানের উদ্দেশ্যে তার ওপর অনুরূপ আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে অথবা অনুরূপ সরকারি কর্মচারী তার সরকারি কর্মচারী হিসেবে আইনসম্মতভাবে করণীয় কর্তব্য সম্পাদন ব্যবস্থিত কোনো কিছু করেছে বা করার চেষ্টা করেছে বলে তাকে আক্রমণ করে বা তার ওপর অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ করে, তবে সেই ব্যক্তি তিন বছর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে, অথবা অর্থদণ্ডে, এমনকি উভয়বিধ দণ্ডেই দণ্ডিত হবে।’ এ ছাড়াও হামলার ধরণ ও মাত্রানুযায়ী দণ্ডবিধির অন্যান্য ধারাও প্রয়োগ করা যেতে পারে।

যখনি চিকিৎসকের উপর কোন হামলা হয়, অনেক চিকিৎসকই তখন ধর্মঘটের কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, চাইলেই যে কোন সংগঠনের পক্ষে দেশব্যাপী সফলভাবে চিকিৎসক ধর্মঘট করা সম্ভব নয়। সকল চিকিৎসকদের অভিভাবক সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনই (বিএমএ) কেবলমাত্র দেশব্যাপী সফল কোন কর্মসূচি পালন করতে পারে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, সারাদেশে চিকিৎসকরা সন্ত্রাসীদের হাতে নিয়মিতভাবে নির্যাতিত হলেও বিএমএকে এক্ষেত্রে খুব একটা সোচ্চার ভূমিকায় দেখা যায় না। প্রশাসন ক্যাডারের কেউ সন্ত্রাসী হামলার শিকার হলে আমাদের প্রিয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাসপাতালে ছুটে যান, কিন্তু স্বাস্থ্য ক্যাডারের কোন চিকিৎসক প্রহৃত হলে তার কোন তৎপরতা চোখে পড়ে না। আচরণ দেখে মনে হয়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসকদের ‘সৎ বাপ’।

তাহলে আমাদের করণীয় কী? আমরা কি মুখ বুজে এভাবে মার খেতেই থাকবো? আমাদের আসলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া আমাদের হাতে খুব বেশী বিকল্প আর নেই। যে কোন সন্ত্রাসী ঘটনার পরে নির্যাতিত চিকিৎসকের প্রথম করণীয় হবে, আইনজীবীর পরামর্শ সাপেক্ষে সন্ত্রাসীদের বিরূদ্ধে থানায় মামলা করা। মামলা নিতে যদি পুলিশ গড়িমসি করে, তাহলে আদালতে মামলা করতে হবে। ভিক্টিম নিজে যদি মামলা না করে, তাহলে আমাদের পক্ষে আইনি লড়াইটা কঠিন হয়ে যায়। এর আগে অন্তত দুটো ঘটনায় উচ্চ আদালতে রিট করবো বলে আইনজীবীদের সাথে আলাপ করে চুড়ান্ত প্রস্তুতি নেবার পরেও শেষ মুহূর্তে ভুক্তভোগী চিকিৎসকের অসহযোগিতার কারণে আমাদের পিছিয়ে আসতে হয়েছিল। সন্ত্রাসী ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও মামলা করতে পারে। তবে অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও মামলা করতে উদ্যোগী হয় না।

সুতরাং, ভিক্টিমকে এগিয়ে আসতেই হবে। সংগঠন হিসেবে আমরা আইনী লড়াইয়ে তাদের পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কয়েকটি মামলায় যদি বিচারের মাধ্যমে সন্ত্রাসীদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তবে হাসপাতালে ডাক্তারের গায়ে হাত তোলার আগে ভবিষ্যতে সন্ত্রাসীরা কয়েকবার ভাববে। এর পাশাপাশি আমরা চাই, চিকিৎসক নিগ্রহের প্রতিটি ঘটনায় আপনারা সবাই ফেসবুকের স্ব স্ব টাইমলাইনে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখুন। প্রতিবাদের মঞ্চ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের শক্তিকে আমাদের পক্ষে কাজে লাগাতে হবে। আরো ভাল হয়, কিছু প্রতিবাদ যদি ইংরেজি ভাষায়ও করা যায়। সারা বিশ্বের মানুষ জানুক, কতটা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা হাসপাতালে কাজ করে।

দিনের শেষে একটাই অনুরোধ, কোন পরিস্থিতিতেই আমাদের হতাশ হলে চলবে না। অন্যায়ের বিরূদ্ধে যখন সোচ্চার হয়েছি, তখন আদায় করেই ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। ফিরে যাবো বলে তো পথে নামি নি।

লেখক: অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাৎ মিল্টন-চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি, রাইটস এন্ড রেস্পন্সিবিলিটিজ (এফডিএসআর)।

এমন ভিন্নধর্মী আরো তথ্য জানতে চোখ রাখুন: https://www.facebook.com/rajtvbd

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button