ডক্টরস কলাম

কোভিডের সাম্প্রতিক উল্টো যাত্রায় আমাদের করণীয়

যে সময়টায় আমরা মনে করতে শুরু করেছিলাম যে করোনাকে বোধ করি শেষ পর্যন্ত বশে আনা গেল, ঠিক তখনই করোনার আবার উল্টো পথে যাত্রা। গত কয়েক দিনে পাল্টে গেছে আমাদের সব করোনা হিসাব-নিকাশ। গত ডিসেম্বরের পর যা হয়নি, এখন তা-ই হচ্ছে। দেশে নতুন করোনা রোগী শনাক্তের দৈনিক সংখ্যাটা আবারও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বাড়ছে আইসিইউয়ের চাহিদা। সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যু; কমছে হাসপাতালে শূন্য কভিড বেড। বাংলাদেশ যখন ১৬ ডিসেম্বর একাত্তরের পর তার ইতিহাসে সবচেয়ে আনন্দঘন সময়গুলো পার করছে, তখন অনেকের মনেই একটু হলেও শঙ্কা—সামনে কী? সংগত কারণেই প্রশ্ন জাগছে, কেন হঠাৎ করে আবার বাড়তে শুরু করল করোনার প্রকোপ, বিশেষ করে আমরা অনেকেই যখন এরই মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়ে ফেলেছি। আসলে সমস্যাটাও সম্ভবত এখানেই।

কয়েক মাস ধরে সফলভাবে করোনাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারায় আমাদের অনেকের মধ্যেই একটু ঢিলেঢালা ভাব চলে এসেছিল। বিশেষ করে বিদায়ি শীতে করোনার দ্বিতীয় ধাক্কাটা সাফল্যের সঙ্গে পাশ কাটিয়ে আমাদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি চলে এসেছিল যে করোনা বোধ হয় চলেই গেল। অনেকে আবার হার্ড ইমিউনিটির তত্ত্বও জোরেশোরে কপচাতে শুরু করেছিল। কার কয়বার এরই মধ্যে করোনা হয়ে গিয়ে থাকতে পারে এ নিয়ে চায়ের কাপে ধোঁঁয়া ক্রমেই জমজমাট আড্ডাগুলোতে। ঢাকাসহ দেশের বড় শহরগুলোতে এরই মধ্যে লাখ লাখ এসিম্পটোমেটিক ইনফেকশনের কারণে হার্ড ইমিউনিটি তৈরি হয়ে গেছে—এমনটা অনেকেই কঠিনভাবে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল। সেই বিশ্বাসের কঠিন ভিত্তিটুকু নাড়ানো মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল ভ্যাকসিন ফ্যাক্টর। প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েই আমরা অনেকেই মনে করতে শুরু করেছিলাম আমাদের কাজ হয়ে গেছে। কভিড আর আমাদের কাছে পাত্তাটাও পাবে না। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম যে ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নেওয়ার সপ্তাহ তিনেক পর ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ প্রতিরোধ তৈরি হয় আর পূর্ণ প্রতিরোধ হয় দ্বিতীয় ডোজেরও তিন সপ্তাহ পর, আর তা-ও ৮০ শতাংশের কিছু বেশি। তার মানে কিন্তু এই নয় যে কোভিশিল্ড কোনো কার্যকর ভ্যাকসিন নয়, বরং বাস্তবতা এর বিপরীত। এটা অবশ্যই কার্যকর আর নিরাপদ। সে প্রসঙ্গে আসছি পরে। পৃথিবীতে আসলে শতভাগ কার্যকর কোনো ভ্যাকসিন নেই। এটা শুধু কভিডের বেলায়ই নয়, বরং এটা প্রযোজ্য যেকোনো সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধেই। যেমন—হেপাটাইটিস ‘বি’। লিভারের ডাক্তারি করি বলেই আমরা দুজনই জানি যে পৃথিবীতে এমন বেশ কিছু মানুষ আছে, যারা হেপাটাইটিস ‘বি’ ভ্যাকসিন নিয়েও পরবর্তী সময়ে হেপাটাইটিস ‘বি’ জনিত লিভার রোগে ভুগছে। তাই বলে কি আপনি-আমি ভ্যাকসিন নেব না? অবশ্যই নেব, ভুলে গেলে চলবে না যে কভিড ভ্যাকসিন না নিয়ে পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত মারা গেছে বহু মানুষ; কিন্তু ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও এ পর্যন্ত সারা দুনিয়ায় কভিডে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা তার ধারেকাছেও না। একইভাবে হেপাটাইটিস ‘বি’র ভ্যাকসিন নিয়ে পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত কোটি মানুষ প্রাণে বেঁচেছে, ভ্যাকসিন নেওয়ার পরও এই ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা সে তুলনায় একেবারেই কম!

আমাদের ঘরের দুয়ারে এই যে আবারও কড়া নাড়ছে কভিড, তার আরেকটি বড় কারণ আমরা স্বাস্থ্যবিধিগুলো পুরোপুরি ভুলে বসে আছি। মাস্ক যে কী পদার্থ, তা আমাদের মগজ থেকে বোধ করি পাকাপোক্তভাবে বেরিয়ে গেছে। ভ্যাকসিনের দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার পরও মাস্ক পরা চালিয়ে যেতে হবে। কারণ আমি হয়তো দুটি ডোজ নিয়ে সুরক্ষিত হয়ে যাব, তার পরও আমার থেকেও ছড়াতে পারে এই ভাইরাস আমার প্রিয়জনের শরীরে—এটুকু ভুলে গেলে চলবে না। তাই থুতনির নিচে নয়, প্যান্টের পকেটেও নয়, মাস্ক থাকতে হবে মুখজুড়ে, নাক আর মুখ আবৃত করে।

আমাদের কেন যেন মনে হয় আমরা যারা টক শোগুলোতে যাই মানুষকে আরেকটু সচেতন করতে, তারা অনেক সময়ই নিজেদের আরেকটু বেশি জাহির করতে গিয়ে মাঝেমধ্যেই তালগোল পাকিয়ে ফেলি। এই যেমন ইদানীং আলোচনায় ব্রিটিশ, ব্রাজিলিয়ান আর সাউথ আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্ট। কারো কারো বিশ্বাস এসব ভ্যারিয়েন্টের কোনো একটি দিয়েই ইদানীং বাংলাদেশে ছড়াচ্ছে কভিড। হতেই পারে! ব্রিটেনে ৮০ শতাংশ আর জাপানের ৪০ শতাংশ কভিড রোগ তো এখন ব্রিটিশ ভ্যারিয়েন্ট দিয়েই। কিন্তু বাংলাদেশেও যে তেমনটাই ঘটছে তার প্রমাণ কি কারো কাছে আছে? একইভাবে আরেক দল বিশেষজ্ঞের ধারণা, এখন বাংলাদেশে চলছে কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ। দ্বিমতও আছে কারো কারো। তাঁদের মতে, এটি প্রথম ঢেউয়েরই জলোচ্ছ্বাস। আবার কারো মতে, এটি কভিডের তৃতীয় ঢেউ। ভ্যারিয়েন্ট আর ঢেউ যা-ই হোক না কেন, মুক্তি কিন্তু ওই মাস্কেই।

একইভাবে মাঝেমধ্যে ঝামেলা পাকিয়ে ফেলে মিডিয়াও। যে জিনিস যেখানে বলার নয়, আলোচনা চলে তা-ই নিয়ে। যেমন—নরওয়েতে যখন ফাইজারের ভ্যাকসিন নিয়ে ২৩ জন বয়স্ক মানুষের মৃত্যুর ইস্যুটি এলো, তখন কোনো কোনো চ্যানেলে বলতে শুনেছি নরওয়ে সরকার ‘দাবি’ করছে এসব মৃত্যু ভ্যাকসিনের কারণে নয়। কয়েক দিন আগে টিভির খবরে দেখলাম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘দাবি’ করেছে অ্যাস্ট্রাজেনেকার ভ্যাকসিন নেওয়ার সঙ্গে রক্ত জমাট বাঁধার কোনো যোগাযোগ নেই। খবর পরিবেশনের ভাবখানা এমন যে যোগাযোগটা থাকলেও থাকতে পারে; কিন্তু নরওয়ের সরকার আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অন্য রকম দাবি করছে। আসলে বিষয়টা কিন্তু একেবারেই উল্টো। একটি দায়িত্বশীল সরকার বা বিশ্ব সংস্থা কখনোই এ ধরনের কোনো কিছুর দাবি করে না। তারা যা করে তা জেনে, বুঝেশুনেই করে। ভ্যাকসিন নিয়ে ঘরে ফেরার পথে কেউ যদি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে, তা যেমন ভ্যাকসিনের দোষে নয়, তেমনি ভ্যাকসিন নেওয়ার পর কোনো বয়স্ক মানুষের মৃত্যু কিংবা কারো কারো শরীরে রক্তে জমাট বাঁধার দায়ও ভ্যাকসিনের ঘাড়ে চাপানোটা ঘোরতর অন্যায়। বাস্তবতা হলো, আজকের দিন পর্যন্ত পুরো পৃথিবীতে একজন মানুষও কভিড ভ্যাকসিন নেওয়ার ফলে মৃত্যুবরণ করেনি।

আর যারা ভাইরাসের ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই, যত বেশি মানুষ যত তাড়াতাড়ি ভ্যাকসিন নেবে আর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবে, ভাইরাসের নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্ট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা ততই কমে আসবে। কারণ ভাইরাস যত দ্রুত ছড়াবে, তার মিউটেশনের সংখ্যাও ততই বাড়বে, বাড়বে নতুন নতুন ভ্যারিয়েন্টের আশঙ্কা। এটাই ভাইরাসের ধর্ম। আমরা যদি ভ্যাকসিন না নিই কিংবা স্বাস্থ্যবিধি মেনে না চলি, তাহলে সামনে হয়তো কভিডের বাংলাদেশি ভ্যারিয়েন্টও দেখা দিতে পারে।

আজকে আমাদের মনে সামনে কী হয় এই নিয়ে শঙ্কা। লকডাউন যখন আবারও কিঞ্চিৎ আলোচনায়, তখন শঙ্কিত না হয়ে লকডাউনকে নক আউট করার একটাই রাস্তা আমাদের সামনে খোলা আছে। আর তা হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, মাস্ক পরা, বারবার হাত ধোয়া আর অপ্রয়োজনে জমায়েত না করা। কোনো আলোচনা কিংবা গবেষণার দরকার নেই, বিশ্বাস করুন, আমরা যদি শুধু এটুকু করতে পারি আর সময়-সুযোগ মতো ভ্যাকসিন নিয়ে নিই, হলফ করে বলতে পারি ২০২১ আমাদের জন্য ২০২০-এর মতো হবে না। আর তা না করলে কী হবে, তা স্রষ্টাই ভালো জানেন।

লেখকদ্বয়: 
অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল,
চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্যসচিব,
সম্প্রীতি বাংলাদেশ
ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবর,
গবেষক, এহিমে বিশ্ববিদ্যালয়,
জাপান
এমন আরো তথ্য পেতে চোখ রাখুন: http://facebook.com/rajtvbd

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button