ডক্টরস কলাম

সংসদে পাগলের প্রলাপ এবং স্পীকার সমীপে নিবেদন

গত ১৯ তারিখ ছিল ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ত্রিশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। লিখি লিখি করেও লেখা হয়ে ওঠেনি এ নিয়ে। কারণ কিছুটা আলসেমি, কিন্তু তারচেয়েও বড় কারণটা হলো ভয়। ভয়টা দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে। নির্মূল কমিটি শুধু যে পৃথিবীর বৃহত্তম সিভিল সোসাইটি মুভমেন্ট তাই নয়, এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে চলমান সফল আন্দোলনের নামও বটে। ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের যে ক্রমাগত পেছনে হাঁটা আর জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়ার সরকারগুলোর নিঃশর্ত পৃষ্ঠাপোষকতায় ’৭১-এর পরাজিত শক্তির এদেশে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে বেড়ে ওঠা, সেই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ‘বাংলাদেশত্ব’ আর ‘বাঙালিত্বও’ ধরে রাখায় প্রথাবিরোধী এই আন্দোলনটির সূচনা। সূচনাটি ছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের হাত ধরে এবং চলার পথে যে ছিল কত বাধা আর বিঘ্ন সে তো সহজেই অনুমেয়।

নির্মূল কমিটির গত ত্রিশ বছরের ইস্যুভিত্তিক অবদানগুলো নিয়ে লিখতে বসলে ‘মহাপ্রবন্ধ’ লেখা হয়ে যাবে। কাজটা কঠিন, কারণ বিশাল সেই ব্যাপ্তি। গত বছর নির্মূল কমিটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে একটি লেখা লিখতে বসে আমার এই শিক্ষাটি হয়েছে হাড়ে হাড়ে। ’৭৫ পরবর্তী বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীগুলো তাদের পাকিস্তানী প্রভুদের সন্তুষ্টি আদায় করতে গিয়ে আওয়ামী লীগকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরেছিল প্রতিবেশী একটি দেশের লেজুড়ভিত্তিক দল হিসেবে। জয় বাংলা থেকে বাংলাদেশ বেতার- খোলনলচে পাল্টে ফেলা হয়েছিল ’৭১ আর মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিংবা সম্পৃক্ত প্রতিটি জিনিস। পাকিস্তানীরা হয়েছিল হানাদার, অর্বাচীন মেজর হয়েছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক আর নরঘাতক গোলাম আযম হয়ে বসেছিলেন দেশের নিয়ন্তা।

শরণার্থী জীবন শেষে বঙ্গবন্ধুকন্যার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের নতুন করে চলার সূচনা। সেইসঙ্গে আবার সঠিক গন্তব্যে যাত্রা শুরু বাংলাদেশেরও। কারণটা সঙ্গত। কারণ ‘এ দেশ আর এ দল’ একে অপরের সমার্থক মাত্র। আর বাংলাদেশের সেই নতুন পথ চলায় সঙ্গী ছিল নির্মূল কমিটি। সেদিনের আওয়ামী লীগ অনেক সত্যই উচ্চারণ করতে পারেনি। কারণ দালালের দল সেসব সত্যকে অনায়াসে উড়িয়ে দিত ভারতের দালালি বলে। আর বোকার মতো বিভ্রান্ত প্রজন্ম গিলেও বসত মিথ্যার সেই ট্যাবলেটগুলো। আওয়ামী লীগ তথা বাংলাদেশের জন্য সেই সত্যগুলো উচ্চারণের প্রেক্ষাপটটি তৈরি করেছে নির্মূল কমিটি দফায় দফায়, নানা প্রেক্ষাপটে, নানা সময়ে এবং করে চলেছে আজও। গোলাম আযমের বিচারের জন্য গণআদালত থেকে শুরু করে এই সেদিন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যবিরোধী অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঘিরে লাখো জনতার মানববন্ধন- এমনি অসংখ্য উদাহরণ ছড়িয়ে আছে নির্মূল কমিটির গত ত্রিশ বছরের চলার পথের বাঁকে বাঁকে। আর সে কারণেই বাংলাদেশের যারা বিবেক সেসব প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সম্পৃক্ত থেকেছেন নির্মূল কমিটির আন্দোলন-সংগ্রামে বরাবরই। নামের তালিকা এই লেখার দৈর্ঘ্যকে বাড়িয়ে আর ভুল করে বাদ পড়া কোন একটি নামের যে ভার সেই ভার সামলানোর সাধ্য আমার সাধ্যাতীত। তবে এটুকু জেনে রাখুন বাদ ছিলেন না কেউই এবং বাদ নেই এখনও কেউই।

নির্মূল কমিটি যার দালালি করে তার নাম ‘বাংলাদেশ’। আর এই দালালিতে নির্মূল কমিটি সংশ্লিষ্ট কারও কোন রাখ-ঢাকের বালাই নেই। সেই দালালির জায়গা থেকেই নির্মূল কমিটির লক্ষ্য এদেশ থেকে সেসব দালালকে নির্মূল করা যাদের আফ্রিদিকে দেখলে বলতে ইচ্ছে করে ‘মেরি মি’। আর ফেসবুকে ‘আমি রাজাকার’ লেখা টি-শার্ট পরে সেলফি পোস্ট করাতেই যাদের বিকৃত আনন্দ। নির্মূল কমিটির সঙ্গে যুক্ত আমরা কেউই ঘাতক নই, কারও টুঁটি চেপে ধরা বা টেনে-হিঁচড়ে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো আমাদের এজেন্ডাও নয়। এর জন্য রাষ্ট্র আছে, আছে রাষ্ট্রের আইন। আমাদের কাজ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের পাশে থাকা সহায়ক হিসেবে। পাশাপাশি ‘বাংলাস্তানী’ ধ্যান-ধারণা আর আদর্শগুলোকে সমূলে উৎপাটন করাও আমাদের লক্ষ্য বটে।

‘ঘাতক’, ‘দালাল’ আর নির্মূলের এই ভেদাভেদ বোঝার মেধা যার থাকবে আমার বিশ্বাস তিনি আর যাই করুন বা না-ই করুন, কোন জেনারেলের দালালি করে এমপি-মন্ত্রী হবার খায়েশে নিজের মুক্তিযোদ্ধা সত্তাকে বিসর্জন দিতে পারেন না। পারেন না মওলানা মান্নানের মতো রাজাকার যার মন্ত্রী ছিল, সেই জেনারেলের ছবি পোস্টারে ছেপে নির্বাচনে প্রার্থী হতে। ক্ষমতা আর অর্থের মোহে কিছু মুক্তিযোদ্ধা যে এদেশে দেশবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হননি তা অবশ্যই নয়। তবে তাদের পরিণতিও আমাদের জানা। তাদের গলিত শবদেহ তুলে আনতে হয়েছে প্রত্যন্ত পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে আর তাদের পাকাপোক্ত আসন হয়েছে ইতিহাসের ভাগাড়ে। তাই সংসদে দাঁড়িয়ে নির্মূল কমিটি নিয়ে কোন অর্বাচীন কি মন্তব্য করল তা আমাদের কাছে কোন বিবেচনাতেই বিবেচ্য নয়। এতে নির্মূল কমিটির কিছুই যায় আসেও না। আমাদের অস্বস্তির জায়গা একটাই। জাতীয় সংসদের কার্যবিবরণীতে কোন পাগলের এমনি প্রলাপ আর বিকৃত ইতিহাস বাণীবদ্ধ হয়ে থাকলে তা আমাদের গণতান্ত্রিক আর সংসদীয় ঐতিহ্যকে কলঙ্কিত করে। তাই জাতীয় সংসদের স্পীকার সমীপে আমাদের বিনীত নিবেদন, ‘অনুগ্রহ করে এই পাগলের প্রলাপটুকু এক্সপাঞ্জ করুন স্পীকার’!

লেখক :

অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

ও সাধারণ সম্পাদক, চিকিৎসা সহায়তা কমিটি

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি

এমন আরো তথ্য পেতে চোখ রাখুন: http://facebook.com/rajtvbd

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button