ডক্টরস কলাম

সাম্প্রতিক পাকি লম্ফ-ঝম্ফ নিয়ে উপলব্ধি

প্রকৃতিতে কেমন যেন একটা শীত-শীত ভাব, গরমটা ঠিকঠাকমতো জেঁকে বসতে শুরু করেনি এখনও। মার্চের শেষে বাংলাদেশে এমন আবহাওয়াটাই অবশ্য প্রত্যাশিত। কিন্তু দেশের আবহাওয়াটা কেমন যেন গুমোট। মাত্রই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেছে টার্কিশ এয়ারওয়েজের ভিভিআইপি ফ্লাইটটি। ইস্তানবুল থেকে ঢাকা আসার পথে ইসলামাবাদে অনির্ধারিত সংক্ষিপ্ত যাত্রাবিরতি করেছে বিমানটি। সেখান থেকে বিমানটিতে চেপেছেন আরেকজন ভিভিআইপি। শোনা যাচ্ছে বিমানটির এই দ্বিতীয় ভিভিআইপি আর কেউ নন, স্বয়ং পাক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান নিয়াজী। কোন ধরনের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ আর প্রোটকলের তোয়াক্কা না করেই বিমানে চেপেছেন প্রধানমন্ত্রী নিয়াজী। গত কদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তির আগেই একাত্তরে তার চাচা, পূর্ব পাকিস্তানে তৎকালীন সামরিক কমান্ডার মেজর জেনারেল আমির আব্দুল্লাহ খান নিয়াজীর নেতৃত্বে যে পৈশাচিক গণহত্যা সঙ্ঘটিত হয়েছিল, তার জন্য ক্ষমা চাইতে যাচ্ছে পাকিস্তান। আর সেই গুজবটাই অবশেষে বাস্তবে রূপ পেতে যাচ্ছে আজ। টার্কিশ এয়ারওয়েজের বিমানটি ইসলামামাবাদ থেকে ওড়ার পরপরই খবরটি ছড়িয়ে পড়েছে মিডিয়ায়। আলজাজিরা তো রীতিমতো ব্রেকিং নিউজ করছে। ভাবখানা এমন যেন আজকের এই করোনা জর্জরিত পৃথিবীতে এর চেয়ে বড় খবর আর কিছুই নেই। বিমানবন্দরেও জনতার মিছিল। ‘মেরি মি নিয়াজী’, ‘আমি রাজাকার’ ইত্যাদি ব্যানার হাতে উৎসুক জনতার চাপে বিমানবন্দরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রায় ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম!

বিমান থেকেই নেমেই একাত্তরের অপকর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন প্রধানমন্ত্রী নিয়াজী। আহ্বান জানালেন অতীত ভুলে গিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবার। অটোমান সাম্রাজ্যের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে বৃহত্তর ইসলামী ঐক্য গড়ে তোলার বিকল্প যে আর কিছুই হতে পারে না, তার বক্তব্যে রাখঢাক করলেন না সে ব্যাপারেও। উপস্থিত ‘বাংলাস্তানীদের’ বিপুল করতালির মধ্যে বিমানবন্দর ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী নিয়াজী। গন্তব্য অনিশ্চিত, তবে আলজাজিরা জানাচ্ছে, বিমানবন্দর থেকে পাকিস্তানী হাই কমিশনারের মার্সিডিজ বেঞ্জে চেপে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাবেন তিনি। সেখানে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সরাসরি ফিরে আসবেন বিমানবন্দরে। টার্কিশ এয়ারওয়েজের অপেক্ষমাণ ভিভিআইপি ফ্লাইটটিতে চেপে ফিরতি যাত্রা করবেন নিজ দেশের উদ্দেশে।

॥ দুই ॥

মুসলমান হিসেবে জন্ম নেয়াটা বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সম্ভবত বড় ধরনের অপরাধ। একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশে যে নজিরবিহীন গণহত্যার শিকার হয়েছিল, তার জন্য সরাসরি দায়ী ছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আর তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস, জামায়াত-ই-ইসলাম, নেজাম-ই-ইসলাম, মুসলিম লীগ ইত্যাদি। এরা সবাই ছিল শতভাগ মুসলমান, কিন্তু তারপরও তাদের হাত থেকে রেহাই পায়নি এদেশের মুসলমানরা। বরং ‘আধা-মুসলমান বাঙালীদের’ ‘সাচ্চা-মুসলমানে’ রূপান্তরিত করার জন্য এদেশে নির্বিচারে, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালী নারীদের ধর্ষণের অনুমতি দেয়া হয়েছিল, যাতে যুদ্ধপরবর্তী বাংলাদেশে একটি ‘সাচ্চা-মুসলমান শঙ্কর জনগোষ্ঠীর’ উদ্ভব হয়।

কক্সবাজারের আশ্রয় শিবিরগুলোতে নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের দুঃখ গাথায় আবেগাপ্লুত টার্কিশ ফার্স্ট লেডির অশ্রু বিসর্জনে অশ্রু সজল হয়েছিলাম আমরাও। অথচ সেই তুরস্কই লাখ-লাখ সিরীয় শরণার্থীকে নিজ দেশে নাগরিকত্ব দিলেও রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তাদের ঐ চোখের জল পর্যন্তই। সিরীয় শরণার্থীরা নাগরিকত্ব পেলে তুরস্কের সরকারী দলের ভোট বাক্সে জমা পড়ে তাদের ভোটগুলো, আর এই সিরীয়দের দেখেশুনে বোঝারও জো নেই যে, তারা আসল না নকল টার্কিশ। কিন্তু ভিন্ন-সংস্কৃতির, কালো-বেটে রোহিঙ্গাদের দিয়ে সেই কাজটা তো ঠিকঠাক মতো হবে না, হোক না তারা যতই মুসলমান!

উইঘুর মুসলমানদের দুঃখে এতদিন বিগলিত ছিল টার্কিশ হৃদয়। চীনের হাতে নির্যাতিত আর মানবাধিকার বঞ্চিত এই বেচারা উইঘুর মুসলমানদের পাশে বলতে গেলে ঐ এক তুরস্ক ছাড়া আর কোন মুসলমান দেশকেই পাওয়া যায়নি। এখন সেখানটাতেও ইউটার্ন। চায়নার সিনোভ্যাক ভ্যাকসিন হাতে পেয়ে তারা বেমালুম ভুলে গেছে উইঘুরদের কথা। চায়নার কাছ থেকে আশি লাখ ডোজ ভ্যাকসিন কিনছে তুরস্ক আর এর বিনিময়ে তারা চীনের সঙ্গে তাদের অপরাধী প্রত্যাবাসন চুক্তিটি পরিবর্তন করতে যাচ্ছে বলে জানাচ্ছে নিকি এশিয়া। এতে উইঘুর বংশোদ্ভূত তুরস্কের নাগরিকরা বিপদে পড়বেন। তাতে অবশ্য থোরাই কেয়ার ‘সুলতান সোলায়মানের’ উত্তরসূরিদের।

নিজ দেশ বেলুচিস্তানে এই সেদিনও গণহত্যা আর নারী ধর্ষণের অকাট্য প্রমাণ যে পাকিস্তান সেনাবহিনীর বিরুদ্ধে, ভারতে কাশ্মীরীদের জন্য সেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর চোখের জলে প্রায়শই সিন্ধু নদে বান ডাকি-ডাকি অবস্থা হয়। অথচ উইঘুর তো উইঘুর, যে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাইয়ে তার এত দৌড়ঝাঁপ, সেদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে পড়ে থাকা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারেও জনাব নিয়াজী ‘স্পিকটি নট’। কারণটা অবশ্যই বোধগম্য এবং ব্যাখ্যা নিষ্প্রয়োজন।

॥ তিন ॥

প্রথম যে কাল্পনিক দৃশ্যপটটি দিয়ে লেখাটার সূচনা, সেই দৃশ্যপটকে বাস্তবে নামিয়ে আনায় নানামুখী তৎপরতা সাম্প্রতিককালে লক্ষণীয়। দেশের নাম করা দৈনিক আর অনলাইন পোর্টালে সাম্প্রতিক দু’একটা লেখা দেখে আমার মনে হয়েছে, এ দেশের কেউ কেউ আমাদের আবার পাকিস্তানী বটিকা গেলানোর গ্রাউন্ড ওয়ার্কটা শুরু করেছেন। ঢাকায় নবনিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনারের ছুটাছুটিও লক্ষণীয়। কখনও প্রধানমন্ত্রীর ছবি ছাপিয়ে ফুলদানি নিয়ে ছুটছেন গণভবনে, তো কখনও সিমলা চুক্তির কপি নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পকিস্তানের তরফ থেকে জানানো হয়েছে বাংলাদেশী নাগরিকদের পাকিস্তানে যাবার ক্ষেত্রে সব ধরনের বিধিনিষেধ তুলে নেয়ার কথাও। বেচারারা কেন যেন আমাদের খুব বোকা মনে করে! তাদের ধারণা দু’দেশের মধ্যে অবাধ যাতায়াতে যে বাংলাদেশটা পাকিস্তানী জঙ্গী দিয়ে ভরে যাবে তা বোঝার মতো মগজ আমাদের করোটিতে নেই। আর যে সিমলা চুক্তি বগলদাবা করে হাইকমিশনার সাহেবের সেগুনবাগিচা যাত্রা, ঐ চুক্তিতেই তো একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য পাকিস্তানী সেনাসদস্যদের বিচারের কথা বলা আছে। হাইকমিশনার সিদ্দিকী কেন যে আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মহোদয়কে এতটা অজ্ঞ মনে করলেন সেটাও আমার অজানা।

॥ চার ॥

বাহাত্তরে দেশে ফেরার আগে লারকানার জেল থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ভুট্টোর বাগান বাড়িতে। ভুট্টো সে সময় বঙ্গবন্ধুকে অনেক চাপাচাপি করেছিল পাকিস্তানের সঙ্গে ঢিলেঢালা হলেও একটা সম্পর্ক রেখে দেয়ার ঘোষণা দিতে। বঙ্গবন্ধুর সাফ জবাব ছিল তিনি দেশে না ফিরে তার মানুষের সঙ্গে কথা না বলে কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না। কারণ, বাঙালী তাকে সেই ম্যান্ডেট দেয়নি। হাইকমিশনারের ফুলদানিতে যে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মন গলবে না সেটা তো বলাই বাহুল্য। কারণ, তিনি তো বঙ্গবন্ধুর কন্যা। তার ধমনীতে তো শ্রেষ্ঠতম বাঙালী বঙ্গবন্ধুর রক্ত প্রবহমান। হাইকমিশনারকে তিনি মুখের ওপর জানিয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানকে ক্ষমা করার প্রশ্নই আসে না।

॥ পাঁচ ॥

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর ঠিক আগে ভাগে আমাদের উৎসবে আর গৌরবে পানি ঢেলে দেয়ার এই সাম্প্রতিকতম পাকিস্তানী অপচেষ্টাটি জানি কখনই আলোর মুখ দেখবে না। ধর্ষণ করে মাফ চাইলে ধর্ষকের পাপ মোচন হয় না। অপরাধ মোচন হয় না খুন করে খুনীর মাফ চাওয়াতেও। পাকিস্তান মাফ চাইল কি চাইল না তার থোরাই পরোয়া করে বাংলাদেশের মানুষ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের অন্যতম সৌন্দর্য হচ্ছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা আর প্রত্যেককে তার প্রাপ্যটা কড়ায়-গণ্ডায় বুঝিয়ে দেয়া। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের একজন গর্বিত বাঙালী হিসেবে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়া আর তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে ধর্ণা দেয়ার অলস সময় আমাদের নেই। দেশে নিজের পয়সায় তৈরি হয় পদ্মা সেতু আর মহাকাশে ওড়ে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট। তাই আমাদের দাবি, বাংলাদেশের মানুষের রক্তে লাল যেসব পাকিস্তানী নরপশুর হাত, তাদের বিচার আর রাষ্ট্রের পাওনাগুলো বুঝিয়ে দেয়া হোক কড়ায়-গণ্ডায়। আমাদের কারও দয়ার আর ক্ষমার দরকার নেই। বাংলাদেশের চাই ন্যায্য পাওনা, চাই ন্যায় বিচার। আমরা নিশ্চিত এ বিষয়ে একমত দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশপ্রেমিক বাঙালী।

আর বলাই বাহুল্য খুব ভাল করেই জানি, যে কাল্পনিক দৃশ্যপটটি টেনে এনেছিলাম এই লেখার শুরুতে তা কখনই বাস্তবে হবার নয়। কারণ, আমাদের আস্থা শেখ হাসিনায়।

লেখক : অধ্যাপক ডাঃ মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও

সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

এমন ভিন্নধর্মী আরো তথ্য জানতে চোখ রাখুন: https://www.facebook.com/rajtvbd

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button